ফার্ণিচার তৈরির ইতিহাস

কখন কোন ফার্নিচার আবিষ্কৃত হয় আমরা বর্তমানে যে আধুনিক ফার্নিচার ব্যবহার করছি সেগুলো কিন্তু একদিনে আসে নি। এর পিছনে রয়েছে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সংগ্রাম। অনেক কারিগর ফার্নিচার ডিজাইনে নিজেদের সময় ব্যয় করেছেন। তাদের এত গবেষণার ফলেই আজ আমরা আরামদায়ক আসবাবপত্র ব্যবহার করতে পারছি। সব ফার্নিচার কিন্তু একই সময়ে আবিষ্কার হয় নি। নানান সময়ে একের পর এক ফার্নিচারের আবিষ্কার আমাদের জীবন যাত্রাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এক সময় আমরা কাঠের চৌকিতে ঘুমাতাম। কিন্তু তোশক/জাজিমের কল্যাণে কোমল বিছানা পেয়ে গেলাম। চেয়ারের কারণে বসার জায়গা খুঁজে পেলাম। আজকে আলোচনা করব ফার্নিচার আবিষ্কারের ইতিহাস নিয়ে। কখন কোন ফার্নিচার আবিষ্কৃত হয় সেটাই তুলে ধরব সবিস্তারে।

খাট: খাট কখন আবিষ্কার হয় সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেই মানুষ পাথরকে খাট হিসাবে ব্যবহার করত। তবে ফ্লোর থেকে উপরে এমন বেড সর্বপ্রথম মিশরীয়দের ব্যবহার করতে দেখা যায়। মিশরীয়রা তালের কাঠ দিয়ে খাট বানিয়ে ঘুমাতো। প্রাচীন গ্রীকদের আমলে কাঠের বেডের প্রচলন শুরু হয়। এরপর নানা বাঁধা পেরিয়ে হালের আধুনিক খাটের রূপ লাভ করে।

সোফা: প্রথম দিকে সোফা ক্যানেপি নামে পরিচিত ছিল যা লো-ব্যাকের হত। অর্থাৎ পিঠের পিছনে অল্প উঁচু হত। এখানকার মত পিঠ এলিয়ে দেওয়া যেত না। এরপর ফ্রেঞ্চের লোকজন সেটাকে সোফা ডাকা শুরু করে। ১৬৯০-১৭২০ এর মাঝে কাঠের খাঁজ করা ডিজাইনের সোফার বেশ প্রচলন ছিল। এ সময় সোফা তৈরির কারিগররা আরও কমফোর্টেবল সোফা বানাতে থাকে। ১৮৯৫ সালে আধুনিক সোফা আবিষ্কার হয়। যা পূর্বের সোফা থেকে অনেক কমফোর্টেবল। এরপর দিনে দিনে সোফার ডিজাইনের অনেক উন্নতি হয়েছে।

ম্যাট্রেসঃ ম্যাট্রেসের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। তখন অবশ্য বর্তমানের ম্যাট্রেসের মত ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক যুগের লোকেরা ঘাস কিংবা খড়কুটা অথবা গাছের পাতা বেড হিসাবে ব্যবহার করত। মিশরীয়রা ছাগলের চামড়াকে বেড হিসাবে ব্যবহার করত। রোমানরা উল বা পাখির পালক দিয়ে বেড বানাতো। এরপর ম্যাট্রেসের উল্লেখযোগ্য তেমন পরিবর্তন আসে নি। ১৮ শতকে এসে তুলা, উলের ম্যাট্রেস তৈরি হতে লাগল। এ সময়েই ম্যাট্রেসের কভারের প্রচলন হয়। ১৮৭১ সালে হেনরিখ ওয়েস্টফাল জার্মানিতে স্প্রিং এর ম্যাট্রেস আবিষ্কার করেন। এরপর ১৯২৯ সালে অনেক ব্যয়বহুল রাবারের ম্যাট্রেস তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে ফাইবার গ্লাসের বাতাসের ম্যাট্রেস তৈরি হয়।

টেবিল: মিশরীয়রা সর্ব প্রথম টেবিলের প্রচলন করেন। সে সময় তারা টেবিলে খাবার দাবার রাখত। তবে তারা পাথর দিয়ে এসব টেবিল বানাত। কাঠের টেবিল বানাতে শুরু করে রোমানরা। তবে সে সময় টেবিল এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ১৬ শতকে এসে টেবিলের গুরুত্ব অনুধাবন করল সবাই। এর কয়েক বছর পরেই কাঠ কাটার মেশিন তৈরি হয়। ফলে টেবিল বানানো অনেক সহজ হয়ে যায়। ১৮৯০ এর দিকে টেবিল অনেক সস্তা হয়ে যায়। সে সময় টেবিল এত ক্যাটাগরিতে বিভক্ত ছিল না। ২০ শতকে এসে মানুষের কাজের সুবিধা অনুযায়ী টেবিলকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তখন খাবারের জন্য ডাইনিং টেবিল, গেম খেলার জন্য গেমিং টেবিল, অপ্যায়ন করানোর জন্য টি টেবিল, সাজগোজ করার জন্য ড্রেসিং টেবিল, পড়াশুনা করার জন্য রিডিং টেবিল, কম্পিউটার চালানোর জন্য কম্পিউটার টেবিল তৈরি হল। টেবিলের সাইজও বিভিন্ন রকম হয়ে গেল।

চেয়ার: টেবিলের মত চেয়ারও মিশরীয়রা আবিষ্কার করে। তারাই প্রথম ৪ পা ওয়ালা বসার সিট তৈরি করে। তখন অবশ্য চেয়ার নাম পায় নি। এরপর খৃষ্টপূর্ব ২৬৩০ এ চেয়ার সদৃশ বস্তুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সে সময় চেয়ারগুলো মাটি থেকে সামান্য উঁচু ছিল। রেনেসাঁর যুগে চেয়ার আরও উন্নত হতে লাগল। ১৮০০ সালের পর চেয়ার গরীবদের ঘরেও চলে যায়। এ সময় কাঠের তৈরি চমৎকার ডিজাইনের চেয়ার পাওয়া যেত। ১৯০০ এর পরে চেয়ার আরও আধুনিক হতে থাকে। কাঠের চেয়ারের পাশাপাশি স্টিলের চেয়ারও বাজারে আসে। আর বর্তমানে রকিং চেয়ার, ইজি চেয়ার, দোলনা চেয়ার অনেক রকমের চেয়ারই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। বোর্ডের চেয়ারও পাওয়া যায়।

আলমারি: আলমারির উৎপত্তি সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয় প্রাচীনকাল থেকেই আলমারির প্রচলন ছিল। ১৬ শতকে ইউরোপ কাঠের উপর নকশা করা আলমারি দেখা যায়। বিদ্যুৎ আবিষ্কার হওয়ার পরপরই স্টিলের আলমারি আবিষ্কার হয়। এই স্টিলের আলমারি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর ফলে আলমারির ওজন অনেক হালকা হয়ে যায়। বর্তমানে কাঠের আলমারির প্রচলন নেই বললেই চলে।

ওয়ারড্রোবঃ ১২ শতকে এসে ওয়ারড্রোব আবিষ্কার হয়। এর আগে মানুষ সিন্দুকের ভিতরে জামা কাপড় রাখত। প্রথম দিকে ওয়ারড্রোবে কোন ড্রয়ার বা দরজা ছিল না। তাকের উপর হ্যাঙ্গারারের মত কিছু একটা দিয়ে জামা কাপড় রাখা হত। এরপর ১৮ শতকে কাঠের তৈরি আরও উন্নত মানের ওয়ারড্রোব বাজারে আসে। এ সময় ওয়ারড্রোবের ভিতর দরজাও লাগানো হয়। ১৯ শতকে এসে ওয়ারড্রোব আকারে আরও ছোট হতে থাকে। ইংল্যান্ডের উপনিবেশ আমলে ওয়ারড্রোবের পুরোটা জুড়েই দরজা দেওয়া হয়। এ দরজা ড্রয়ারকেও ঢেকে ফেলত। এক সময় উপরের দিকে গ্লাসের দরজার ওয়ারড্রোবও আসে। এ সময় আলমারি স্টিলের হয়ে গেলে কাঠের রাজত্ব চলে ওয়ারড্রোবের। আধুনিক যুগে এসে পুরোটাই ড্রয়ারের করা হচ্ছে। এক পাশে ছোট একটা দরজা রাখা হয়। তবে এখনও স্টিলের তৈরি ওয়ারড্রোব বাজারে আসে নি বলে কাঠের ওয়ারড্রোব আজও তার স্বকীয়তা বজায় রাখছে।

প্রাচীনকালে আবিষ্কৃত ফার্নিচারগুলোর সুস্পষ্ট সাল জানা যায় না। সে সময় সাল গণনাই শুরু হয় নি। যেখানে সাল পাওয়া যায় নি সেখানে প্রাচীনকাল লেখা হয়েছে। আশা করছি ফার্নিচার আবিষ্কারের ইতিহাস জেনে আপনাদের ভাল লাগবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *