ফার্নিচারের ব্যবহারের ইতিহাস

আমরা প্রতিদিন নিত্য প্রয়োজনে ফার্নিচার ব্যবহার করে থাকি। ফার্নিচার ছাড়া আমরা এক প্রকার অচল বলা যায়। ঘুমাতে গেলে খাটের প্রয়োজন, খেতে গেলে ডাইনিং টেবিলের প্রয়োজন, বসতে গেলে চেয়ার-সোফার প্রয়োজন, পড়তে গেলে রিডিং টেবিল প্রয়োজন, সাজতে গেলে ড্রেসিং টেবিল প্রয়োজন। বাসার ভিতর আমাদেরকে প্রতিটি কাজেই ফার্নিচারের মুখাপেক্ষী হতে হয়। ফার্নিচার যেমন ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তেমনি আমাদের প্রয়োজনও মেটায়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন কী করে এলো আজকের ফার্নিচার? এর শুরুটা কোথায় হয়েছিল? আদিম যুগের মানুষ কী রকম ফার্নিচার ব্যবহার করত? আপনার এসব প্রশ্ন জাগলেও জানার সুযোগ নেই। ফার্নিচারের ইতিহাস নিয়া বাংলায় কোন লেখা নেই। আজ আমি আপনাদের শোনাব ফার্নিচারের ইতিহাস।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ:

মানুষ যখন স্থায়ীভাবে কোথায়ও বসবাস করতে শুরু করে তখন থেকেই ফার্নিচারের সূচনা হয়। কিছু ইউরোপীয় ঐতিহাসিক মনে করেন ফার্নিচারের সূচনা হয় পাথরের মাধ্যমে। সে যুগে মানুষ পাথর কেটে ফার্নিচার বানাত। ইতিহাস থেকে জানা যায় খৃষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপে পাথরের ফার্নিচারের প্রচলন হয়। সে সময় মানুষ পাথরের কুটিরে তিমির হাড় দিয়ে ছাদ দিয়ে বসবাস করত। ভিতরে পাথরকে বেড হিসাবে ব্যবহার করত। জামা কাপড়, থালা বাসন রাখার জন্য পাথর দিয়ে অনেকটা বর্তমান ওয়ারড্রোবের মত বানাত।

প্রাচীন মিসরীয় যুগ:

প্রাচীন মিসরীয় যুগে ধনীরা বৃহৎ বাড়িতে বসবাস করত। ফ্লোরে টাইলস লাগানো হত আর দেওয়ালে নান রঙের পেইন্ট দেওয়া হত। তাদের ঘরে থাকত কাঠের তৈরি ফার্নিচার। সে সময় তারা কাঠ দিয়ে খাট, চেয়ার ও টেবিল তৈরি করতে পারত। তবে সে সময় তাদের বালিশ ছিল না। কাঠের হেডরেস্ট বালিশ হিসাবে ব্যবহার করত। আর নিচু শ্রেণির মানুষেরা সাধারণ বাড়িতে বাস করত।

প্রাচীন গ্রীক যুগ:

প্রাচীন গ্রীক যুগেও খুবই সাধারণ মানের ফার্নিচার ছিল। মানুষ পালঙ্কে আরাম আয়েশ করত। এই পালঙ্ক খুবই সাধারণ মানের ছিল। এটি ছিল সিম্পল একটি কাঠের ফ্রেম যা দড়ি দিয়ে টানানো থাকত। এটাকেই তারা বেড হিসাবে ব্যবহার করত।

রোমান যুগ:

রোমানদের ফার্নিচার অনেক উন্নত ছিল। তারা বেশ আরামদায়ক ফার্নিচার ব্যবহার করত। পালঙ্ক সুন্দর করে খোদাই করা হত। তাদের এসব কাজে শিল্পের ছোঁয়া পাওয়া যায়। আলোর জন্য তেলের বাতি ব্যবহার করত।

মধ্য যুগ:

জানা যায় মধ্য যুগে এক রাজা বিশাল প্রাসাদে বাস করতেন। তিনি বেডেই ঘুমাতেন। বেডের সাথে ছিল একটি পর্দা। যা প্রাইভেসি রক্ষা করত। সে সময় অভিজাত লোকদের বাড়িতে ফায়ার-প্লেস লক্ষ্য করা যেত। মূলত শীত থেকে বাঁচতেই তারা এসব করত। তবে সে সময়েও ফার্নিচার জনপ্রিয়তা লাভ করে নি। শুধু সম্ভ্রান্ত লোকদের বাসায় চেয়ার, বেড, টেবিল থাকত।

১৭ শতক:

১৭ শতকে এসে ফার্নিচার আধুনিক হতে লাগল। অত্যন্ত সুন্দর করে ফিনিশিং দেওয়া হত। আরামদায়ক হলেও ১৭ শতকের শুরুতে ফার্নিচার খুবই সাধারণ মানের আর অনেক ভারি ছিল। তবে এ শতাব্দীতে বেশ কিছু নতুন ফার্নিচারের আগমন ঘটে, ড্রয়ার ওয়ালা সিন্দুক, গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, বুককেস তাদের মধ্যে অন্যতম। সিন্দুক সবার মাঝেই বিদ্যমান ছিল।

১৮ শতক:

১৮ শতাব্দীতে এসে ফার্নিচার আরও কমফোর্টেবল হতে লাগল। ডিজাইনেও নতুনত্ব আসল। এ সময় টমাস চিপেনডেল বেশ কিছু চমৎকার ডিজাইনের ফার্নিচার তৈরি করেন। ১৭৫৪ সালে তিনি “the gentleman and cabinet makers director” নামে একটি ক্যাটালগ প্রকাশ করেন ফার্নিচার ডিজাইনের উপর। ১৭৮৮ সালে জর্জ হ্যাপেলহোয়াইট ফার্নিচারেরর উপর The Cabinet Maker and Upholsterer’s Guide নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তার বইটি বেশ সমাদৃত হয়েছিল। এ সময় টমাস শেরাটন, ডানকান ফাইফ কেবিনেট মেকার হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

১৯ শতক:

ঊন বিংশ শতাব্দীতে এসে ব্যাপকহারে ফার্নিচার উৎপাদন হতে থাকে। দাম কম হওয়ায়্ খুব সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু ডিজাইনের জন্য তেমন সুবিধা করতে পারে নি। এ সময় মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতেও প্রচুর ফার্নিচার লক্ষ্য করা যেত। পুরাতন ফার্নিচারের সাথে বেশ কিছু নত্তুন ফার্নিচার সংযোজন হয়। তবে সে সময়েও দরিদ্র লোকেরা খড় কুটায় ঘুমাত। বেড কেনার মত প্রয়োজনীয় টাকা তাদের কাছে ছিল না। ১৯ শতকে ফার্নিচারের পাশাপাশি অলংকারেরও বেশ প্রশার ঘটে। নিত্য নতুন ডিজাইনের গহনা বাজারে আসতে থাকে।

২০ শতক:

২০ শতকে এসে শুরু হয় বিলাস বহুল সব ফার্নিচার নির্মাণ। এ সময় কাঠের পাশাপাশি প্লাস্টিক, প্লাইউড বোর্ড, ফাইবার গ্লাসের ফার্নিচার নির্মাণ শুরু হয়। ডিজাইনেও বেশ চাকচিক্য আসে। আধুনিক যুগে ফার্নিচার নির্মাণে কমফোর্টের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময় জাজিম, ম্যাট্রেস, ফোমের বেড, সোফা, কুশনের মত আরামদায়ক আসবাব আসে। বর্তমানে ফার্নিচার ঘরের অতি প্রয়োজনীয় জিনিষ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাপী ফার্নিচারের ব্যাপক প্রচলন হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মাঝে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে কে বেশি নতুনত্ব আনতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে চমৎকার সব ডিজাইনের ফার্নিচার। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকের মাঝেই ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি অন্য মাত্রায় চলে যাবে।

আধুনিক যুগে এসে ফার্নিচার বেশ হালকা হয়ে যাচ্ছে। আগের ফার্নিচারের প্রচুর ওজন ছিল। কিন্তু মডার্ন ফার্নিচার ওজনে খুবই হালকা। ফাইবার গ্লাস প্রযুক্তি আসার পর আরও বেশি হালকা হয়ে গেছে। এমনকি একজনে বহন করার মত পোর্টেবল ফার্নিচারও চলে এসেছে। ফার্নিচার নির্মাতারা চেষ্টা করেছেন আরও নতুন নতুন মেটালের ফার্নিচার বানাতে। বোর্ডের ফার্নিচার অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। সামনে বোর্ডের মত এমন হালকা মেটালের ফার্নিচার আসার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক যুগে এসে মাল্টিপল ফার্নিচারও এসে গেছে। এ ফার্নিচার একইসাথে একাধিক কাজে ব্যবহার করা যায়। এ যুগে এসে ফার্নিচার নির্মাতারা ডিজাইনের উপরে বেশ জোর দিচ্ছে। ক্রিয়েটিভ ডিজাইনের ফার্নিচার এনে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয়। আর ক্রেতারাও ভাল ডিজাইন খুঁজেন।

আমরা ফার্নিচারের বিশাল লম্বা ইতিহাস জানলাম। যদিও আমি ইংরেজি আর্টিকেল থেকে অনুবাদ করে লিখেছি। ফার্নিচারের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম লিখা। আশা করছি সবাই এটা থেকে উপকৃত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *