বিখ্যাত রাজা-বাদশাহদের ফার্নিচার-২

পূর্বের অংশ: বিখ্যাত রাজা-বাদশাহদের ফার্নিচার-১

রাজা বাদশাহরাও আমাদের মতই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই কয়েকজন রাজা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছেন। তারা এতটাই পরাক্রমশালী ছিল যে তাদের নাম শুনলে মানুষ ভয়ে কাঁপত। কিন্তু যতই প্রভাব প্রতিপত্তি থাকুক না কেন তাদেরকেও ফার্নিচার ব্যবহার করতে হয়েছে। রাজ সিংহাসনও ছিল একটি ফার্নিচার। কিন্তু যারা প্রবল প্রতাপে বিশ্ব শাসন করেছেন কেমন ছিল তাদের ফার্নিচার? তারা কোন কোন ফার্নিচার ব্যবহার করত? আপনার মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে। বিশ্ব কাঁপানো রাজা-বাদশাহ, সম্রাটদের ব্যবহার্য আসবাবপত্র নিয়ে থাকছে ২ পর্বের ধারাবাহিক টিউন। আজ দ্বিতীয় পর্বে থাকবে খিলাফতের পরবর্তী সুলতান/বাদশাহদের ফার্নিচারের ইতিহাস।

উমর ইবনে আব্দুল আজীজের ফার্নিচার: উমর ইবনে আব্দুল আজিজকে বলা হয় ইসলামের পঞ্চম খলিফা। তিনি বংশানুক্রমে ক্ষমতায় আসলেও পরে জনগণের রায়ে খিলাফতের দায়িত্ব নেন। তিনি অত্যন্ত ন্যায়-পরায়ণ শাসক ছিলেন। বর্তমানে ফার্নিচার বলতে যা বুঝায় তেমন কিছুই ছিল না তার ঘরে। ঘুমানোর জন্য একটা চৌকি তার উপর তোশকের মত কিছু একটা ব্যবহার করতেন। মাটিতে মাদুর বিছিয়ে বসে খেতেন। বাসনপত্র ছিল পিতলের। একবার তার স্ত্রী রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অলংকার বানাতে চাইলে তিনি কঠোরভাবে তা নিষেধ করে দেন।

হারুনুর রশিদের ফার্নিচার: খলিফা হারুনুর রশিদ ছিলেন আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তার সময়ে মুসলমানরা প্রায় বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ শাসন করত। জ্ঞান বিজ্ঞানের জন্য বাগদাদ খুব বিখ্যাত। আব্বাসীয়দের রাজধানী ছিল বাগদাদ। সে সময়ে বাগদাদে স্বর্ণমুদ্রা আর হিরার জহরতে চকচক করত। হারুনুর রশিদের রাজ প্রাসাদ বেশ চাকচিক্য ছিল। তাদের মত এমন ঝাঁক-ঝমকপূর্ণ রাজ প্রাসাদ বিশ্বের আর কোথায়ও ছিল না। রাজ প্রাসাদের অভ্যন্তরে অভিজাত ফার্নিচারে ভরপুর ছিল। প্রবেশদ্বার থেকে সিংহাসন পর্যন্ত পুরোটাই গালিচা মাড়ানো ছিল। সিংহাসন ছিল স্বর্ণ খচিত। অত্যন্ত দামি বেডে ঘুমাতেন। আলমারি, তলোয়ার রাখার খাপ, ডাইনিং টেবিল কোন কিছুর কমতি ছিল না। আব্বাসীয়দের রাজ প্রাসাদের এতই জৌলুস ছিল যে এর পাশে দিয়ে কেউ গেলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখত।

সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবীর ফার্নিচার: সালাউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন মিশরের সুলতান। তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ক্রুসেডের কারণে। খৃষ্টানদের ষড়যন্ত্র বারবার রুখে দিয়েছেন। তিনিই খৃষ্টানদের কবল থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসকে উদ্ধার করেন। আজ পর্যন্ত খৃষ্টানরা সেটা উদ্ধার করতে পারে নি। ইতিহাস বিখ্যাত এ সুলতান খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাকে জীবনের বেশিরভাগ সময়ই যুদ্ধের ময়দানে কাটাতে হয়েছিল। ফলে বাসায় তেমন ফার্নিচার ছিল না। শোবার খাট, টেবিল, বসার চেয়ার ছাড়া বলার মত তেমন কিছু ছিল না। যুদ্ধের ময়দানে থাকলে তাবুতেই রাত কাটাতেন। মাটির উপর ত্রিপল বিছিয়ে সেখানেই ঘুমাতেন। সেখানে ফার্নিচার বলতে শুধু আরামদায়ক তোষক ছিল।

চেঙ্গিস খানের ফার্নিচার: চেঙ্গিস খান ছিলেন দুর্ধর্ষ মোঙ্গল সম্রাট। নিষ্ঠুরতার জন্য তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তাকে সিংহাসন দখল করতে হয়েছিল রক্তের ভাইকে হত্যা করে। তার বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ হত্যার অভিযোগ আছে। এই ভয়ংকর বাদশাহর রাজ দরবার ছিল ঝাঁক জমকপূর্ণ। কাঠের উপর কারুকাজ করা চমৎকার ডিজাইনের সিংহাসনে বসতেন। ঘুমাতেনও তেমন দামি খাটে। এ ছাড়া টেবিল, চেয়ার সবই ছিল তার রাজ প্রাসাদে। তবে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় যুদ্ধের ময়দানে কাটাতেন। যুদ্ধের সময় কী কী ফার্নিচার ব্যবহার করতেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না।

সুলতান মাহমুদের ফার্নিচার: সুলতান মাহমুদ ছিলেন কনৌজের অধিপতি। তবে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ভারতবর্ষে অভিযানের জন্য। তাকে বলা হয়ে ইতিহাসের অন্যতম গ্রেটেস্ট বিজেতা। কারণ তিনি কোন যুদ্ধে পরাজিত হন নি। ১৭ বার ভারতে অভিযান চালিয়ে প্রতিবারই বিজয়ী হন। এসব অভিযানে তিনি প্রচুর ধন রত্ন লাভ করেন। ধারণা করা হয় তিনি যেহেতু বেশিরভাগ সময়ে যুদ্ধ করতেন তাই তার প্রাসাদ ততটা ঝাঁক জমকপূর্ণ ছিল না। খাট, টেবিল, চেয়ার, পালঙ্ক, নরম বেড এসবই ছিল তার ফার্নিচার।

বাবরের ফার্নিচার: জহিরুদ্দীন বাবর ছিলেন ভারতে মোঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ভারতে মোঘল সম্রাজ্যের সূচনা করেন। তার হাত ধরেই প্রায় ৩০০ বছর ভারত শাসন করে মোঘলরা। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি মোঘল বংশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সে জন্য তাকে বেশ কিছু যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ী বাবর এসব প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানেন নি। বাবরের রাজ প্রাসাদে অভিজাত্য ছিল না। সিংহাসন ছাড়া বাকি সবই সাধারণ মানের ফার্নিচার ছিল। তিনি সর্বদাই মোঘল সম্রাজ্য শক্তিশালী করা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন বলেন বিধায় ফার্নিচারের দিকে নজর দেন নি তেমন।

বাদশাহ আলমগীরের ফার্নিচার: বাদশাহ আলমগীর ওরফে আওরঙ্গজেব ছিলেন মোঘলদের মাঝে সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্রাট। তিনি প্রায় ৫০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেন। আওরঙ্গজেব ছিলেন প্রজা-দরদী ও দয়ালু শাসক। রাজ প্রাসাদ তেমন চাকচিক্যময় ছিল না। সাধারণ ফার্নিচারই ব্যবহার করতেন।

অটোমানদের ফার্নিচার: অটোমানরা তুর্কি শাসন করত। তুর্কি অটোমান সম্রাজ্য স্থাপন করে গোটা মধ্যপ্রাচ্য নিজেদের করায়ত্তে এনেছিল। ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের কারণে অটোমান সম্রাজ্যের পতন হয়। অটোমানরা অনেক উদার মনের শাসক ছিল। তাদের রাজদরবারে শোভা পেত বাহারি সব ফার্নিচার। ওই সময়ে যা কিছু পাওয়া যেত সবই ছিল তাদের সংগ্রহে।

ব্রিটিশ রাজ পরিবারের ফার্নিচার: ব্রিটিশরাও এক সময় বহু রাষ্ট্রকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল। বর্তমানে ব্রিটিশ রাজ পরিবারে অত্যাধুনিক সব ফার্নিচারই আছে। এমন সব ফার্নিচার আছে যা বাংলাদেশে এখনও আসে নি। খাট, বেড, ডাইনিং, ড্রয়িং টেবিল, আলমারি, র‍্যাকার, বাথটাব, রকিং চেয়ার, সোফা সবই আছে। ব্রিটেনের রাণী অত্যন্ত দামি সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজ পরিবারের ফার্নিচারও অনেক মূল্যবান।

সৌদি রাজ পরিবারের ফার্নিচার: উসমানিয়া খিলাফত ভেঙ্গে গেলে মধ্য প্রাচ্যে অনেকগুলো রাষ্ট্র হয়। সেখান থেকেই ১৯৩২ সালে সৌদি রাজ পরিবার গঠিত হয়। যারা এখনও সৌদি শাসন করছে। ভোগ বিলাসে সৌদি রাজ পরিবার ব্রিটিশদেরও ছাড়িয়ে যায়। এমন কোন মডার্ন ফার্নিচার পাবেন না যা ওদের কাছে নেই। শোনা যায় একেকটা ফার্নিচারের দাম কয়েক কোটি টাকা। সৌদি বাদশাহ নিজের পছন্দমত ডিজাইনে আসবাবপত্র বানিয়ে থাকেন। এক কথায় এরা ফার্নিচারের উপরেই হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *