বিখ্যাত রাজা-বাদশাহদের ব্যবহৃত ফার্নিচার পর্ব-১

রাজা বাদশাহরাও আমাদের মতই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই কয়েকজন রাজা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছেন। তারা এতটাই পরাক্রমশালী ছিল যে তাদের নাম শুনলে মানুষ ভয়ে কাঁপত। কিন্তু যতই প্রভাব প্রতিপত্তি থাকুক না কেন তাদেরকেও ফার্নিচার ব্যবহার করতে হয়েছে। রাজ সিংহাসনও ছিল একটি ফার্নিচার। কিন্তু যারা প্রবল প্রতাপে বিশ্ব শাসন করেছেন কেমন ছিল তাদের ফার্নিচার? তারা কোন কোন ফার্নিচার ব্যবহার করত? আপনার মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে। বিশ্ব কাঁপানো রাজা-বাদশাহ, সম্রাটদের ব্যবহার্য আসবাবপত্র নিয়ে থাকছে ২ পর্বের ধারাবাহিক টিউন। আজ প্রথম পর্বে থাকবে প্রাচীন রাজদের ফার্নিচারের ইতিহাস।

বাদশাহ নমরুদের ফার্নিচার: নমরুদ ছিল প্রাচীন সিনারের রাজা। সে এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে আল্লাহকে পর্যন্ত স্বীকার করত না। নিজেকে খোদা বলে দাবি করেছিল। হযরত ইব্রাহীম (আ) কে আগুনে পোড়ানোর ষড়যন্ত্র করেছিল। নমরুদের ফার্নিচার সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয় তিনি পাথর বা কাঠের খোদাই করা সিংহাসনে বসে রাজত্ব করতেন। শোবার জন্য বিশেষভাবে তৈরি বেড ব্যবহার করতেন।

ফেরাউনের ফার্নিচার: ফেরাউন ছিল হযরত মুসা (আ) এর সময়কার বাদশাহ। তবে ফেরাউন তার প্রকৃত নাম নয়। প্রাচীন মিশরের ফারাওদের উপাধি ছিল ফেরাউন। মুসা (আ) এর সময়কার ফেরাউনের নাম ছিল দ্বিতীয় রামেসিস এটাই প্রসিদ্ধ মত। ফেরাউন কাঠের কারুকাজ করা সিংহাসনে বসে রাজত্ব করতেন। বেড ছিল কাঠের তৈরি বর্তমান খাটের মত। তবে মাথার দিকটা পশুর মাথার আকৃতি দেওয়া হত। ধীরে ধীরে ঢালু করে মুল বেডের সাথে মিশানো হত। এতে এটাকে বালিশ হিসাবে ব্যবহার করতে সুবিধা হত। তার সভাসদে ছিল বর্তমান গোল টেবিলের মত কাঠের আসবাব। আবার নৌকার তলার মত কাঠের তৈরি আরেক ধরণের বেড লক্ষ্য করা যেত।

বাদশাহ দাউদ (আ) এর ফার্নিচার: দাউদ (আ) ছিলেন নবী ও রাসূল। তার উপর আসমানি কিতাব যবুর নাজিল হয়। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন অতিবাহিত করতেন। দাউদ (আ) এর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত সুমধুর ছিল। তার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে মাছেরা পর্যন্ত ডাঙ্গায় উঠে আসত। তিনি খুবই সাদাসিধে চেয়ারে বসে রাজ্য পরিচালনা করতেন। যদিও তিনি বিশাল সম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। তার সিংহাসন ছিল অতি সাধারণ মানের চেয়ার। বেড ছিল ৬ পা বিশিষ্ট।

সোলাইমান (আ) এর ফার্নিচার: হযরত সোলাইমান (আ) ছিলেন বিখ্যাত পয়গম্বর। তিনি প্রায় সমগ্র বিশ্ব শাসন করতেন। বাতাসের গতিতে চলতে পারতেন। কোন জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছা হলে বাতাস তার সিংহাসন সহ উঠিয়ে নিয়ে যেত। তিনি পশুপাখির ভাষাও বুঝতেন। সোলাইমান (আ) এর সিংহাসন ছিল পাথর ও কাঠের তৈরি। নিচে ছিল পাথর। উপরে কাঠের বেড়ি। বেডও ছিল অতি সাধারণ কাঠের তৈরি। পরে তিনি রাণী সাবার মুক্তা খচিত সিংহাসন অধিকার করেন।

বাদশাহ জুলকারনাইন এর ফার্নিচার: বাদশাহ জুলকারনাইন সমগ্র বিশ্ব জয় করেছিলেন। প্রসিদ্ধ মতে আলেক্সেন্ডার দ্যা গ্রেটই বাদশাহ জুলকারনাইন। তিনি অত্যন্ত ন্যায় পরায়ণ শাসক ছিলেন। তার সিংহাসনের নিচের দিকটা ছিল বেতের আর উপরে কাঠের। সামনে দুইটি সিংহের মাথার চিত্র ছিল। জুলকারনাইনের বেড কেমন ছিল সে সম্পর্কে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা হয় তিনি কাঠের সাধারণ বেডে ঘুমাতেন। কোন চাকচিক্য ছিল না।

হযরত মুহাম্মদ (স) এর ফার্নিচার: মুহাম্মদ (স) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। রাসূল (স) নবুয়ত প্রাপ্ত হওয়ার পর মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। কোন অনাড়ম্বন ছিল না। মোটা কাপড় পরতেন। নিজ হাতে আটা তৈরি করতেন। ফার্নিচার বলতে তেমন কিছু ছিল না। খাট বলতে ৪ পায়ার একটি তক্তপোশ। এই কাঠের উপরেই ঘুমাতেন। ঘরের ভিতর বসার জন্য কোন চেয়ার ছিল না। মাটিতে বসে আহার করতেন। কোন টেবিলও ছিল না। আহার পাত্র সব মাটির ছিল। চামড়ার তৈরি কিছু কম্বল আর চাঁদর ছিল। দরজার ভিতর কালো কাপড়ের পর্দা ছিল। ঘরের চাল ছিল খেজুর গাছের। এ ছাড়া বলার মত আর কোন আসবাবপত্র ছিল না। রাজত্ব করতেন মসজিদে নববীতে বসে। সেখানে কোন সিংহাসন ছিল না। সাধারণের সাথে হোগলায় বসে সব কিছুর দিক নির্দেশনা দিতেন। তারপরও তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব।

আবু বকর (রা) এর ফার্নিচার: হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা। তিনি ইসলামের ক্রান্তিকালে হাল ধরেন। তাকে বলা হয় মুসলিম সম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা। রাসূল (স) এর মত তিনিও অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। ঘরে আসবাবপত্র তেমন ছিল না। একটি ছোট চৌকিতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমাতেন। মাটির পাত্রে খেতেন, বসতেন মাটিতে। মিম্বারে বসে রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনা করতেন।

উমর (রা) এর ফার্নিচার: হযরত উমর (রা) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তার সময়ে রুম ও পারস্য বিজয় হয়। এ সময় মুসলিম সম্রাজ্য ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। তিনিও রাসূল (স) এর মত সহজ সরল জীব যাপন করতেন। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্র কঠোর ছিলেন। তার ঘরেও তেমন ফার্নিচার ছিল না। চৌকির উপর ঘুমাতেন। দস্তর খানায় বসে আহার করতেন। খাবারের পাত্র তামা আর মাটির ছিল। পশমের তৈরি ভারি কম্বল ছিল। যা দিয়ে শীত নিবারণ করা হতে। তার দরবারে কোন সিংহাসন ছিল না।

উসমান (রা) এর ফার্নিচার: হযরত উসমান (রা) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি রাসূল (স) এর দুই কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন বলে তার উপাধি জুন নুরাইন। সে সময় আরবদের মাঝে অত্যন্ত ধনী হলেও সাধারণ জীবন যাপন করতেন। প্রায় সব সম্পদই দান করে দিয়েছিলেন। মোটা আটার রুটি খেতেন। ঘরে কোন চেয়ার টেবিল ছিল না। মাটিতে বসে আহার করতেন। আসবাব বলতে একটি চৌকি ছিল।

আলী (রা) এর ফার্নিচার: হযরত আলী (রা) ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা। তিনি রাসূল (স) এর কনিষ্ঠ কন্যা হযরত ফাতেমা (রা) কে বিয়ে করেছিলেন। আগে থেকেই অনেক গরীব ছিলেন। ফলে ঘরের ভিতরে তেমন আসবাবপত্র ছিল না। রাসূল (স) এর দেওয়া একটি কম্বলই ছিল সম্বল। মাটির বিছানায় ঘুমাতেন। সম্পদ বলতে তাদের তেমন কিছু ছিল না। তিনি একবারেই নিরহংকারী ছিলেন।

পরবর্তী অংশ: বিখ্যাত রাজা-বাদশাহদের ব্যবহৃত ফার্নিচার পর্ব-২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *